ডিএসসিসি অঞ্চল-১০-এর জন্মনিবন্ধনে বাড়তি টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ! রেজিস্ট্রেশন সহকারী আহম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

ডিএসসিসি অঞ্চল-১০-এর জন্মনিবন্ধনে বাড়তি টাকা আদায়ের গুরুতর অভিযোগ! রেজিস্ট্রেশন সহকারী আহম্মদ হোসেনের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি

ক্রাইম রিপোর্টারঃ

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অঞ্চল-১০-এর জন্মনিবন্ধন শাখায় অনিয়ম, দুর্নীতি, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য ও সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ধলপুর আঞ্চলিক কার্যালয়ের রেজিস্ট্রেশন সহকারী আহম্মদ হোসেন চৌধুরী। তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দালালের মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজ পরিচালনা, সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের সুযোগ তৈরি এবং অফিসের বাইরে বাসায় বসে টাকার বিনিময়ে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন অভিযোগকারীরা।
অভিযোগকারীদের দাবি, অঞ্চল-১০-এর ৫৮, ৫৯, ৬১ ও ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন তৈরি, তথ্য সংশোধন ও অন্যান্য সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে নানা ধরনের হয়রানি ও দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও দালালের মাধ্যমে অতিরিক্ত ১,০০০ থেকে ১,৫০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা আদায়ের অভিযোগ
জন্মনিবন্ধন নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সেবা। এ ক্ষেত্রে সরকার নির্ধারিত ফি অনুসরণ করার কথা থাকলেও অভিযোগকারীদের দাবি, সংশ্লিষ্ট এলাকায় সেই নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, কখনো সার্ভার সমস্যার কথা বলা হয়, আবার কখনো বিভিন্ন অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা হয়। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও নির্ধারিত ফি ঠিক থাকার পরও কাজ বিলম্বিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পরে দালালের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে অতিরিক্ত অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ সম্পন্ন করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয় বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।
তাঁদের আরও দাবি, প্রতিদিন এভাবে হাজার হাজার টাকা আদায় করা হয়। তবে এসব অর্থ লেনদেনের পরিমাণ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
চার ওয়ার্ডে দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগ
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের অঞ্চল-১০-এর ৫৮, ৫৯, ৬১ ও ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজে বিভিন্ন দালালের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, রেজিস্ট্রেশন সহকারী আহম্মদ হোসেন চৌধুরীকে কেন্দ্র করে কিছু দালাল কাজ পাইয়ে দেওয়া বা দ্রুত সম্পন্ন করার নামে সেবাপ্রার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত টাকা নিয়ে থাকে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এ ধরনের পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ নিয়মমাফিক সেবা পাওয়ার পরিবর্তে দালালের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এতে সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হচ্ছে।
বাসায় বসে জন্মনিবন্ধনের কাজ করার অভিযোগ
আহম্মদ হোসেন চৌধুরীর বিরুদ্ধে আরও অভিযোগ রয়েছে, তিনি কখনো কখনো অফিসের বাইরে নিজের বাসায় বসে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজ করেন। অভিযোগকারীদের দাবি, তাঁর ছেলের মাধ্যমে বাসায় বসে এসব কাজ সম্পন্ন করা হয়। এমনকি সরকারি ছুটির দিনেও টাকার বিনিময়ে জন্মনিবন্ধনের কাজ করার অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর ছেলে সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী নন। তা সত্ত্বেও তাঁর মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত কাজ পরিচালনার অভিযোগটি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট আবেদন, ডিজিটাল সিস্টেমের লগ, অনুমোদন প্রক্রিয়া এবং অর্থ লেনদেনের তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা যেতে পারে।
অবৈধ উপার্জন ও কয়েক লাখ টাকার সম্পদের অভিযোগ
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, অনিয়মের মাধ্যমে আহম্মদ হোসেন চৌধুরী কয়েক লাখ টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন। তবে তাঁর সম্পদের প্রকৃত পরিমাণ, অর্থের উৎস কিংবা কোনো অবৈধ লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ততার বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি।
তাই অভিযোগকারীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর আয়-ব্যয়ের তথ্য ও সম্পদের উৎস আইনসম্মতভাবে যাচাই করার দাবি জানিয়েছেন। তদন্তে আর্থিক অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা।
বিগত সময় থেকে অনিয়ম চলার অভিযোগ
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সংশ্লিষ্ট এলাকায় জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই চলে আসছে। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়মের কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।
তবে অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত এসব অভিযোগের ধারাবাহিকতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রশাসনিক তদারকির অবস্থা নথিপত্র ও সাক্ষ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে যাচাই করা প্রয়োজন।
সিটি করপোরেশন প্রশাসকের কাছে তদন্ত ও কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি
উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অভিযোগকারীরা।
তাঁদের দাবিগুলো হলো—
১. অঞ্চল-১০-এর ৫৮, ৫৯, ৬১ ও ৬২ নম্বর ওয়ার্ডে জন্মনিবন্ধন-সংক্রান্ত অনিয়ম ও অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন।
২. রেজিস্ট্রেশন সহকারী আহম্মদ হোসেন চৌধুরীর ভূমিকা, দালালদের সঙ্গে সম্ভাব্য যোগসাজশ এবং সরকারি ফির বাইরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ যাচাই।
৩. অফিসের বাইরে বাসায় বসে, ছেলের মাধ্যমে এবং সরকারি ছুটির দিনে অর্থের বিনিময়ে কাজ করার অভিযোগ তদন্ত।
৪. জন্মনিবন্ধনের আবেদন, সংশোধন, অনুমোদন, ডিজিটাল সিস্টেমের লগ ও প্রাসঙ্গিক আর্থিক তথ্য পরীক্ষা করে প্রকৃত ঘটনা উদ্‌ঘাটন।
৫. অভিযোগকারীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং ভুক্তভোগীদের কাছে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের বিষয়ে প্রমাণ সংগ্রহ।
৬. সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আয় ও সম্পদের উৎস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় অনুসন্ধান, যদি তদন্তে আর্থিক অনিয়মের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়।
৭. তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ।
৮. জন্মনিবন্ধন শাখায় সরকারি ফির তালিকা প্রকাশ, প্রতিটি অর্থ গ্রহণে রসিদ প্রদান, নির্ধারিত সময়ে সেবা নিশ্চিত এবং অভিযোগ জানানোর কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা।
৯. দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে দায় প্রমাণিত ব্যক্তিদের নাগরিক সেবার দায়িত্বে রাখার বিষয়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ।
নাগরিক সেবা হোক দালালমুক্ত ও দুর্নীতিমুক্ত
জন্মনিবন্ধন কোনো ব্যক্তি বা দালালচক্রের অবৈধ আয়ের মাধ্যম হতে পারে না। সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও হয়রানির অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তা নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত করবে।
অভিযোগকারীদের জোর দাবি, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক যেন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের ব্যবস্থা করেন। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আহম্মদ হোসেন চৌধুরীসহ দায়ী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট দালালদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা, জন্মনিবন্ধন সেবা পেতে কাউকে যেন আর দালালের দ্বারস্থ হতে না হয় কিংবা সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত টাকা দিতে বাধ্য হতে না হয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করার মাধ্যমে জন্মনিবন্ধন শাখাকে হয়রানিমুক্ত সেবাকেন্দ্রে পরিণত করার দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *